১৫ ফেব, ২০১৪

আকাশ - নির্মলেন্দু গুণ

আমার সমস্ত ভাবনা যখন তোমাকে ছোঁয়,
আমার সমস্ত উপলব্ধি যখন তোমার
আত্মাকে স্পর্শ করে, আমার সমস্ত বোধ
যখন তোমার বোধিতে নিমজ্জিত হয়,
তখন আমার প্রাণের গভীর থেকে
স্বতঃস্ফূর্ত মোহন মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয়
একটি অত্যন্ত সহজ শব্দ…”আকাশ” ।

আমি শব্দটিকে ক্রমাগত উচ্চারণ করি ।
জানি না কেন এ শব্দটিই শুধু
এত বারবার ঘুরে ঘুরে আসে ।
জানি না কী পেয়েছে সে আমার ভিতরে?
আমি লক্ষ্য করেছি, ‘আকাশ’ শব্দটি
উচ্চারিত হওয়ার পরে আমার ভিতরে
আর কোন কষ্টই অবশিষ্ট থাকে না ।
যেন যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বুলেটের মতো
আমার বুকের ভিতরে গেঁথে ছিল
এই যন্ত্রণাক্ত আমাশ শব্দটি ।

তোমার আমার মাঝে আছে এরকম
বক্ষফাটা অনেক আকাশ । – আমি
ব্যর্থ প্রেমিকের মতো মুগ্ধমূর্খচোখে
কেবল তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে ।

অগ্নিতে যার আপত্তি নেই - নির্মলেন্দু গুণ

থামাও কেন? গড়াতে দাও,
গড়াক;
জড়াতে চায়? জড়াতে দাও,
জড়াক ।

যদি পাকিয়ে ওঠে জট,
তৈরি হবে নতুন সংকট
সুখ না হলে দুঃখ দিয়ে
পূর্ণ হবে ঘট ।

ডরাও কেন? এগোতে দাও
জাগুক;
সরাও কেন? আগুনে হাত
লাগুক ।

জীবন শেষে মরণ হয়,
মরণ শেষে হয় কী?
আগ্নিতে যার আপত্তি নেই
মাটিতে তার ভয় কী?

মাছি - নির্মলেন্দু গুণ

একটি মাছি বুকের ‘পরে
একটি মাছি নাকে,
একটি মাছি আমাকে চেনে
একটি চেনে তাকে।

আমাকে চেনে,তাকেও চেনে
সেই মাছিটি কই?
নাকেও নেই, বুকেও নেই
চোখের জলে ঐ।

আক্রোশ - নির্মলেন্দু গুণ

আকাশের তারা ছিঁড়ে ফেলি আক্রোশে,
বিরহের মুখে স্বপ্নকে করি জয়ী;
পরশমথিত ফেলে আসা দিনগুলি
ভুলে গেলে এতো দ্রুতো,হে ছলনাময়ী?

পোড়াতে পোড়াতে চৌচির চিতা নদী
চন্দনবনে আগ্নির মতো জ্বলে,
ভূকম্পনের শিখরে তোমার মুখ
হঠাৎ স্মৃতির পরশনে গেছে গলে ।

ফিরে গেলে তবু প্রেমাহত পাখি একা,
ঝড় কি ছিলো না সেই বিদায়ের রাতে >
ভুলে গেলে এতো দ্রুত, হে ছলনাময়ী,
পেয়েছিলে তাকে অনেক রাত্রিপাতে ।

শব্দের চোখে করাঘাত করি ক্রোধে,
জাগাই দিনের ধূসর প্রতিচ্ছবি ।
না-পাওয়া মুখের মুখর সুষমা দিয়ে,
তবুও তোমার ছলনা-আহত কবি
তোমাকেই লেখে, তোমাকেই রচে প্রিয় !

স্ত্রী - নির্মলেন্দু গুণ

রান্নাঘর থেকে টেনে এনে স্তনগুচ্ছে চুমু খাও তাকে,
বাথরুমে ভেজানো দরোজা ঠেলে অনায়সে ঢুকে যাও-
সে যেখানে নগ্ন দেহে স্নানার্থেই তৈরি হয়ে আছে
আলোকিত দুপুরের কাছে, মনে রেখো, তোমার রাত্রি নেই
অন্ধকার বলে কিছু; বিবাহিত মানুষের কিছু নেই
একমাত্র যত্রতত্র স্ত্রী-শয্যা ছাড়া। তাতেই শয়ন কর
বাথরুমে, পুজোঘরে, পার্কে, হোটেলে,
সন্তানের পাশ থেকে টেনে এনে ঠোটগুচ্ছে চুমু খাও তাকে।

তার প্রতিটি উৎফুল্ল লগ্নে এক-একটি চুম্বন,
প্রতিটি রক্তিম মুখে এক-একটি নিঃশ্বাস দিতে হবে।
সভ্যতা ধংস হোক, গুরুজন দাড়াক দুয়ারে,
শিশুরা কাদতে থাক, যমদূত ফিরে যাবে এবং অভাব
দেখো লজ্জা পেয় ম্লান হবে কিশোরীর মতো।


স্ববিরোধী - নির্মলেন্দু গুণ

আমি জন্মেছিলাম এক বিষণ্ন বর্ষায়,
কিন্তু আমার প্রিয় ঋতু বসন্ত ।

আমি জন্মেছিলাম এক আষাঢ় সকালে,
কিন্তু ভালোবাসি চৈত্রের বিকেল ।

আমি জন্মেছিলাম দিনের শুরুতে,
কিন্তু ভালোবাসি নিঃশব্দ নির্জন নিশি ।

আমি জন্মেছিলাম ছায়াসুনিবিড় গ্রামে,
ভালোবাসি বৃক্ষহীন রৌদ্রদগ্ধ ঢাকা ।

জন্মের সময় আমি খুব কেঁদেছিলাম,
এখন আমার সবকিছুতেই হাসি পায় ।

আমি জন্মের প্রয়োজনে ছোট হয়েছিলাম,
এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি ।

আকাশ সিরিজ - নির্মলেন্দু গুণ

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
ঐ আনন্দে কেটে যাবে সহস্র জীবন।

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
অহংকারে মুছে যাবে সকল দীনতা।

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
স্পর্শসুখে লিখা হবে অজস্র কবিতা।

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
শুধু একবার পেতে চাই অমৃত আস্বাদ।

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
অমরত্ব বন্দী হবে হাতের মুঠোয়।

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
তারপর হব ইতিহাস।